সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স—যেখানে মানুষের সুস্থ হওয়ার আশায় পা রাখার কথা, সেখানে এখন বিরাজ করছে এক ভয়াবহ নরকযন্ত্রণা। তীব্র দাবদাহ আর দীর্ঘ লোডশেডিংয়ের মধ্যে হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটর মাসের পর মাস বিকল পড়ে থাকায় পুরো হাসপাতাল যেন এক ‘মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকারে আর ভ্যাপসা গরমে হাসপাতালের ওয়ার্ড গুলো হয়ে ওঠে আর্তনাদের কেন্দ্রস্থল। ১০০ শয্যা বিশিষ্ট এই সরকারি হাসপাতালটি এখন আর সেবার জায়গা নয়, বরং কষ্টের শেষ ঠিকানা। সরেজমিনে দেখা যায়, ওয়ার্ডের ভেতর গরমে অতিষ্ঠ রোগীরা বিছানায় ছটফট করছেন। যাদের অবস্থা গুরুতর, তাদের অভিভাবকরা নিরুপায় হয়ে হাতপাখা কিংবা খবরের কাগজ দিয়ে বাতাস করে কিছুটা স্বস্তির খোঁজে ব্যস্ত। অনেক রোগীই তীব্র গরম সহ্য করতে না পেরে করিডোরে বা বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন। কিন্তু হাসপাতালের এমন বেহাল দশায় সুস্থ হওয়ার বদলে উল্টো নতুন করে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন রোগীরা।হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ তলার নারী ও পুরুষ ওয়ার্ডের চিত্র আরও মর্মান্তিক। ছোট্ট শিশুদের কান্না আর শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীদের হাঁসফাঁস করা দৃশ্য হৃদয়বিদারক। বনগ্রাম থেকে আসা এক ভুক্তভোগী মা আমেনা খাতুন জানান, তার ৬ বছরের শিশুটি দুই দিন ধরে এখানে ভর্তি। অসহ্য গরমে মেয়েটি সারাক্ষণ কান্না করছে। আমেনা খাতুন আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা এখানে কি চিকিৎসা নিতে এসেছি, নাকি কষ্ট পেতে এসেছি? হাতপাখা দিয়ে আর কতক্ষণ বাতাস করা যায়?" আশপাশের ইউনিয়ন থেকে আসা রোগীদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ গেলে আর আসার নাম নেই। বাধ্য হয়ে অনেকে বাড়ি থেকে চার্জার ফ্যান নিয়ে আসছেন, কারণ হাসপাতালে বিকল্প কোনো শীতলীকরণের ব্যবস্থা নেই। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, হাসপাতালের জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল হয়ে পড়ে আছে। মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দের অভাবই এর মূল কারণ। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় আইপিএসের ব্যবস্থা থাকলেও তা দিয়ে শুধু কিছু লাইট জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু রোগীদের জন্য জরুরি ফ্যান বা লাইফ-সেভিং মেডিকেল যন্ত্রপাতি চালানো অসম্ভব। সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো জরুরি রোগীদের চিকিৎসা। লোডশেডিংয়ের সময় হঠাৎ যদি কোনো শ্বাসকষ্টের রোগীর জন্য ‘নেবুলাইজেশন’ প্রয়োজন হয়, তবে বিদ্যুৎ না থাকায় তা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে। এটি রোগীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ইসা খান বলেন, "আমাদের জেনারেটরটি দীর্ঘদিন ধরে বিকল। বরাদ্দের অভাবে আমরা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা করতে পারছি না। আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি লিখিতভাবে জানিয়েছি। বরাদ্দ পেলেই দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করা হবে। "তীব্র গরমের মধ্যে রোগীদের এই অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত সরকারি হস্তক্ষেপ এবং জরুরি ভিত্তিতে জেনারেটর মেরামতের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। হাসপাতালে এসে সেবা পাওয়ার বদলে রোগীদের এমন আর্তনাদ যেন অবিলম্বে বন্ধ হয়, এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।