সৈয়দ মইনুল হোসেন, জেলা প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ :
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা ৫০ শয্যা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন সাধারণ মানুষের সেবাকেন্দ্রের চেয়ে ‘দালালদের অভয়ারণ্যে’ পরিণত হয়েছে। সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় দরিদ্র রোগীরা পদে পদে শিকার হচ্ছেন প্রতারণার। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের এক শ্রেণির অসাধু চিকিৎসক সরাসরি এই দালাল চক্রের সাথে লিপ্ত হয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের কমিশন। চিকিৎসকের টেবিল থেকে শুরু করে হাসপাতালের গেট পর্যন্ত সর্বত্রই এখন দালালদের জয়জয়কার। অনুসন্ধানে জানা গেছে, হাসপাতালে কোনো রোগী আসার পর চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানোর আগেই ওত পেতে থাকা দালালরা তাদের ‘খদ্দের’ হিসেবে টার্গেট করে। অনেক ক্ষেত্রে খোদ চিকিৎসকই রোগীর ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) দালালের হাতে তুলে দেন। সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যাপ্ত সুযোগ থাকলেও ইচ্ছাকৃতভাবে রোগীদের পাশের প্রাইভেট প্যাথলজি বা ক্লিনিকগুলোতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিপরীতে চিকিৎসকরা পাচ্ছেন প্রায় ৪০% পর্যন্ত কমিশন। দালালরা প্যাথলজি মালিকদের কাছ থেকে আলাদা লভ্যাংশ পায়। ফলে ১ হাজার টাকার পরীক্ষা সাধারণ রোগীদের করতে হচ্ছে ২ হাজার টাকায়। হাসপাতালের প্রবেশপথে দাঁড়ালে দেখা যায় নারী ও পুরুষ দালালদের ভিড়। তারা সাধারণ রোগী বা স্বজন সেজে ঘোরাঘুরি করে। সহজ-সরল গ্রামবাসীকে দেখা মাত্রই ‘মামা, খালা, বুনু’ ডেকে অতি আপন হয়ে ওঠে। রোগীর বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে তারা ‘বিশেষজ্ঞ’ সেজে পরামর্শ দিতে শুরু করে। যতক্ষণ রোগীর পকেটে টাকা থাকে, ততক্ষণ চলে মিষ্টি কথার জাল। সর্বস্ব লুটে নেওয়ার পর এক সময় নিরুদ্দেশ হয়ে যায় তারা। তাড়াইল উপজেলার আশপাশে প্রায় ৩০-৪০ জনের একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয়। তাদের দাপট এতটাই যে, স্থানীয় অনেক প্যাথলজি ও ক্লিনিক মালিকরা তাদের সাথে সুসম্পর্ক রাখতে বাধ্য হন। অভিযোগ আছে, চক্রের অনেক সদস্য স্থানীয় হওয়ার সুবাদে কোনো রোগী বা স্বজন প্রতিবাদ করলে তাদের ওপর চড়াও হয়, এমনকি শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও করে। ভুক্তভোগীদের দাবি " আমরা চিকিৎসা নিতে আসি, হয়রানি হতে নয়। প্রশাসনের সুদৃষ্টি আর আইনের সুশাসনই পারে তাড়াইল হাসপাতালকে দালাল মুক্ত করতে "। তাড়াইল ছাড়াও পার্শ্ববর্তী কেন্দুয়া, ইটনা ও নান্দাইল উপজেলা থেকে আসা রোগীরা এখানে এসে চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন। কয়েকবার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হলেও প্রশাসনের চোখের সামনেই তারা বারবার ফিরে আসছে পুরনো পেশায়। সম্প্রতি তাড়াইল হাসপাতালে ৭ জন নতুন চিকিৎসক যোগদান করেছেন। সচেতন মহলের আশঙ্কা, এই নবাগত চিকিৎসকরাও যদি পুরোনো সিন্ডিকেটের ফাঁদে পা দেন, তবে সাধারণ মানুষের শেষ ভরসাস্থলটুকুও হারিয়ে যাবে। এলাকার সাধারণ মানুষ ও ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে এই দালাল রাজত্ব বন্ধে প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, স্থানীয় একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট হাসপাতালের পরিবেশ নষ্ট করছে। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে এবং দালাল নির্মূলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।