সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
কৌতূহল কখনো কখনো কতটা ঘাতক হয়ে উঠতে পারে, তার এক নির্মম ও করুণ সাক্ষী হলো কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া। সড়কের এক দুর্ঘটনা দেখতে গিয়ে আরেক দুর্ঘটনার বলী হয়ে প্রাণ হারালেন নুরুজ্জামান (৬০) নামের এক বৃদ্ধ। শনিবার (২২ আগস্ট) সকালে উপজেলার বাহাদিয়া পাঁচপীরের মাজারসংলগ্ন ঢাকা–কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে এই মর্মান্তিক হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। সড়ক পার হওয়ার এক অসতর্ক মুহূর্তেই দ্রুতগামী একটি প্রাইভেটকার কেড়ে নেয় বাহাদিয়া বাজারের এই পরিচিত পান ব্যবসায়ীর জীবন। এই অকালমৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া, যা মুহূর্তের মধ্যেই রূপ নেয় তীব্র গণবিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ প্রশাসন থেকে জানা যায়, ঘটনার সূত্রপাত শনিবার সকালে। বাহাদিয়া পাঁচপীরের মাজারসংলগ্ন ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে বিপরীত দিক থেকে আসা দুটি সিএনজিচালিত অটোরিকশার মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। প্রচণ্ড শব্দে হওয়া এই সংঘর্ষে অটোরিকশার কয়েকজন যাত্রী রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হন। দুর্ঘটনার খবর বাহাদিয়া আকন্দ বাড়িতে পৌঁছালে বাড়ির কাছেই ঘটনাটি ঘটেছে জেনে কৌতূহলবশত দেখতে ছুটেন বৃদ্ধ নুরুজ্জামান। বাহাদিয়া বাজারে বহু বছর ধরে পানের দোকান চালানো এই মানুষটি প্রতিদিনের মতোই এলাকাবাসীর পরিচিত মুখ ছিলেন। আহতদের দেখতে ও মূল ঘটনা জানতে দ্রুতগতিতে সড়ক পার হতে যান তিনি। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জের দিকে আসা এক দ্রুতগামী প্রাইভেটকার তাকে বেপরোয়া গতিতে ধাক্কা দেয়। প্রাইভেটকারের ধাক্কায় তিনি ছিটকে পিচঢালা সড়কে আছড়ে পড়েন এবং মাথায় মারাত্মক আঘাত পান। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই নিভে গেল প্রাণ প্রদীপ রক্তাক্ত অবস্থায় নুরুজ্জামানকে সড়কে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে চিকিৎসার জন্য নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে আঘাত এতটাই মারাত্মক ছিল যে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই পথিমধ্যে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। নুরুজ্জামানের অকালমৃত্যুর সংবাদ বাহাদিয়া গ্রাম ও বাজারে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তেই পুরো এলাকায় তীব্র অসন্তোষ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শোকের আবহ দ্রুতই পরিণত হয় ক্ষোভে। দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত উত্তেজিত জনতা ধাওয়া করে ঘাতক প্রাইভেটকারটিকে আটকে ফেলে এবং ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। নিরাপদ সড়কের দাবিতে এবং ঘনঘন ঘটা বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের প্রতিবাদে উত্তেজিত জনতা মহাসড়কে চলাচলকারী আরও কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। এরপর কাঠ, গাছের গুঁড়ি ও ব্যারিকেড দিয়ে ঢাকা-কিশোরগঞ্জ গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে করে মহাসড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়, চরম ভোগান্তিতে পড়েন হাজারও যাত্রী ও সাধারণ পথচারী। ঘটনার তীব্রতা বুঝতে পেরে দ্রুতই পাকুন্দিয়া থানা পুলিশের একটি বিশেষ টিম দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে এবং চালক ও গাড়ি আটকের আশ্বাস দেয়। পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম আরিফুর রহমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, সড়ক দুর্ঘটনায় বৃদ্ধ নুরুজ্জামানের মৃত্যুর খবর পেয়েই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও উত্তেজিত জনতার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ওসি আরও জানান, ঘটনার পরপরই ঘাতক প্রাইভেটকারের চালককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং গাড়িটি জব্দ করা হয়েছে। এ বিষয়ে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করার প্রস্তুতি চলছে। মামলা দায়েরের পর আইনগত সকল প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পাদন করা হবে। নিরাপদ সড়কের দাবি এবং একটি অসতর্ক মুহূর্ত কীভাবে একটি পরিবারকে চিরতরে নিঃস্ব করে দেয়—পাকুন্দিয়ার বাহাদিয়ার এই ঘটনাটি আবারও সেই করুণ বাস্তবতাই তুলে ধরল।