সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :-
আকাশ থেকে ঝরে পড়া বরফ কুচি এক নিমেষেই কেড়ে নিল হাজারো কৃষকের সারা বছরের অন্ন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল থেকে শুরু করে বুধবার বিকেল পর্যন্ত তিন দফায় কিশোরগঞ্জের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে জেলার কৃষি অর্থনীতি। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের দিগন্তজোড়া সোনালী বোরো ধান আর সবুজ সবজি খেত এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী, জেলার ৩ হাজার ৮৬৪ হেক্টর জমির বোরো ধান পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে, ক্ষতির গভীরতা আরও অনেক বেশি। সরেজমিনে দেখা গেছে, মিঠামইনের ঢাকি, কেওয়ারজোড়, ইটনা, অষ্টগ্রাম ও নিকলীসহ জেলার প্রায় প্রতিটি উপজেলায় তাণ্ডব চালিয়েছে এই শিলাবৃষ্টি। অনেক জায়গায় শিলার স্তূপ এতটাই ঘন ছিল যে, দেখে মনে হচ্ছিল তুষারপাতে ঢেকে গেছে বিস্তীর্ণ জনপদ। কিন্তু এই শৈল্পিক শুভ্রতা কৃষকের কাছে হয়ে এসেছে মরণফাঁদ। ইটনা এলাকার কৃষক জসিম মিয়া ভেজা চোখে জানান,"বাবা, চোখের সামনে তিল তিল করে বড় করা ধানগুলো মাটির সাথে মিশে গেল। শিলার ঘায়ে ধানের ছড়াগুলো ভেঙে গেছে, গাছগুলো থেঁতলে গেছে। এখন কাস্তে দিয়ে কী কাটব? শুধু খড়টুকুও অবশিষ্ট নেই। "জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ক্ষয়ক্ষতির শীর্ষে রয়েছে হাওর উপজেলা মিঠামইন। এখানে প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। অন্যান্য উপজেলার চিত্রও ভয়াবহ। ইটনা উপজেলায় ৯৮৬ হেক্টর, অষ্টগ্রাম উপজেলায় ১৪০ হেক্টর, পাকুন্দিয়া উপজেলায় ১২০ হেক্টর ও নিকলী উপজেলায় ১০০ হেক্টর জমির ফসল মাটির সাথে মিশে গেছে। শুধুমাত্র ধান নয়, পাকুন্দিয়া ও হোসেনপুর এলাকায় সবজি চাষিদের কপাল পুড়েছে। শিলার আঘাতে লাউ, শিম, পটল ও করলার মাচা ভেঙে পড়েছে। এছাড়া হাওরাঞ্চলে ঘরবাড়ির টিনের চালা ছিদ্র হয়ে গেছে, যার ফলে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। নিকলী আবহাওয়া কার্যালয়ের কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন জানান, গত মঙ্গলবার রাতে ১৯.৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ঝোড়ো হাওয়ার সাথে বড় আকারের শিলা এই ধ্বংসযজ্ঞের প্রধান কারণ। কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাদিকুর রহমান আজ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদককে বলেন, "হাওরাঞ্চলের কৃষকদের আমরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের দ্রুত তালিকা তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে সরকারি সহায়তা সঠিক হাতে পৌঁছায়। "কিন্তু সরকারি সাহায্যের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রকৃতির এই রুদ্র রূপ। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে যে কৃষকেরা ধানের সোনালী রঙ দেখার অপেক্ষায় ছিলেন, আজ তাদের ঘরে কেবল কান্নার রোল। কিশোরগঞ্জের হাওরে এখন ধানের গন্ধ নয়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কৃষকের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের টুকরো।