সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
নরসুন্দা ও হাওড়-বিধৌত প্রাচীন জনপদ কিশোরগঞ্জ রূপ ও রীতির মেলবন্ধনে বরাবরই ঐতিহ্যের উজ্জ্বল ধারক। কিন্তু শরতের এক স্নিগ্ধ প্রভাতে এই জনপদ সাক্ষী হয়ে রইল এক অনন্য ও ঐতিহাসিক ক্ষণের। হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় রীতি, আবহমান সংস্কৃতির নিখাদ রূপক আর অগণিত ভক্তের হৃদয়ের ব্যাকুলতা একবিন্দুতে এসে মিলিয়ে গেল এক মহামিলন উৎসবে। কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পরম পবিত্র ও আধ্যাত্মিক আচার—‘কুমারী পূজা’। শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক কালীবাড়ী প্রাঙ্গণ ও মণ্ডপে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ আয়োজনে নেমেছিল সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া ভিড়, যেখানে ভক্তির সাগরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল এক স্বর্গীয় অনাবিল আনন্দের। শরতের নীল আকাশে ভাসমান তুলোর মতো মেঘ আর বাতাসের মৃদু শিহরণে যেন ছড়িয়ে পড়েছিল এক আধ্যাত্মিক সুবাস। সনাতন ধর্মীয় ভাবধারা অনুযায়ী, মহাঅষ্টমীর এই বিশেষ তিথিতে পরমেশ্বরী জগজ্জননী দেবী দুর্গার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে এক কোমলমতি কুমারীকে দেবীর আসনে বসিয়ে পূজা আর্চনা করা হয়। ঈশ্বর যে সৃষ্টির প্রতিটিতে নারী সত্তারূপে, বিশেষ করে নিষ্কলঙ্ক, নিষ্পাপ ও নির্মল রূপ ধরে বিরাজ করেন—এই মহাজাগতিক দর্শনকেই কেন্দ্র করে উদযাপিত হয় কুমারী পূজা। যুগে যুগে নারী সত্তার সম্মান, পবিত্রময় মাতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আত্মশুদ্ধির যে পথ কুমারী পূজা উন্মোচন করে, এবার কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কালীবাড়ি মণ্ডপে তার এক অপূর্ব প্রস্ফুটন ঘটল। প্রভাতের সূর্য যখন ভোরের আলোর স্নিগ্ধতা নিয়ে ধরণীকে আলোকিত করছিল, তখন থেকেই কালীবাড়ী মন্দির চত্বরে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। ভক্ত ও দর্শনার্থীদের আগমন কেবল এক মন্দিরের সীমানায় সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছড়িয়ে পড়েছিল চারপাশের রাজপথ ও অলিগলিতে। ঢাকের গুরুগম্ভীর শব্দ, কাঁসরের তীক্ষ্ণ ঝঙ্কার, শঙ্খের পবিত্র ধ্বনি এবং ধূপ-ধুনোর সুবাসে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। পূজার পূর্ব নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই মন্দির প্রাঙ্গণ পূর্ণ হয়ে যায় অগণিত নর-নারীর সশ্রদ্ধ উপস্থিতিতে। মানুষের উপচে পড়া ভিড় কেবল শারীরিক উপস্থিতি ছিল না, তা ছিল এক পরম প্রাপ্তির ব্যাকুলতা, যা গোটা চত্বরকে এক মহাজাগতিক ভক্তিময় পরিবেশ দান করেছিল।
পূজার মূল আচার শুরু হয় দেবীরূপে মনোনীত কুমারীকে বিশেষভাবে সজ্জিত করার মধ্য দিয়ে। লাল রেশমি শাড়ি, আলতা রাঙা চরণ, সুবাসিত পুষ্পমাল্য এবং কপালে লাল চন্দনের তিলকে সজ্জিত হয়ে যখন ছোট্ট কুমারী দেবী আসনে উপবিষ্ট হলেন, তখন উপস্থিত হাজারো ভক্তের মুখ থেকে সমস্বরে ধ্বনিত হয়ে ওঠে দেবীর স্তুতি ও জয়ধ্বনি। ঢাকের ছন্দে ছন্দে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ যেন চারপাশের আবহাওয়াকে এক পরম পবিত্র আবেশে আচ্ছন্ন করে তোলে। মন্ত্রপূত ফুল, বেলপাতা, চন্দন, পঞ্চপ্রদীপ ও পঞ্চামৃতের নৈবেদ্য দিয়ে দেবীর চরণে অঞ্জলি দেওয়া হয়।
পুরোহিতের গভীর অনুধ্যান ও বৈদিক মন্ত্রের উচ্চারণে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে—জগতে সমস্ত নারীতে দেবীর প্রকাশ বিদ্যমান। কুমারী পূজার এই মহান ভাবগাম্ভীর্য শুধু একটি পূজা বা প্রার্থনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তা ছিল প্রতিটি নারীর মর্যাদা ও মাতৃত্বের প্রতি অন্তরের সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা নিবেদনের এক অনন্য দৃশ্যপট। পূজার প্রতিটি ক্ষণ ছিল চোখের জন্য পরম তৃপ্তিকর এবং আত্মার জন্য এক অপার্থিব প্রশান্তির বাহক। আচারের প্রতিটি পর্বে যে নিষ্ঠা ও সুনিয়ন্ত্রিত ভক্তি পরিলক্ষিত হয়েছে, তা উপস্থিত ছোট-বড় সকল ভক্তের মনকে গভীরভাবে স্পর্শ করে যায়। কিশোরগঞ্জের ধর্মীয় ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই পূজার আয়োজন একটি বড় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এতদিন এই অঞ্চলের পুণ্যার্থীরা কুমারী পূজার মহিমান্বিত দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার জন্য রাজধানী ঢাকা, ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশন কিংবা পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী বড় পূজামণ্ডপের দিকে অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকতেন। দূরদূরান্তে ছুটে যেতেন পূজার পূর্ণতা পেতে। কিন্তু এবার নিজের চেনা চত্বরে, প্রিয় শহরের ঐতিহাসিক কালীবাড়ি মণ্ডপে যখন এই মহিমান্বিত পূজার ঘণ্টা বেজে উঠল, তখন পুণ্যার্থীদের আনন্দ ও অনুভূতির জোয়ার বাঁধ ভাঙা উচ্ছ্বাসে রূপ নেয়। স্থানীয় বয়োবৃদ্ধ থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরী—সবাই পরম শ্রদ্ধা ও বিস্ময়ের সাথে উপভোগ করেন এই অভূতপূর্ব মাহেন্দ্রক্ষণ। মণ্ডপে সমবেত অগণিত ভক্তমণ্ডলীর অনুভূতির প্রকাশ ছিল বৈচিত্র্যময় ও গভীর। অনেকেই জীবনের প্রথমবারে মতো এত কাছ থেকে জীবন্ত দেবীর এই রূপ প্রত্যক্ষ করে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। পূজার পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণের সময় বহু ভক্তের চোখে জল আর হাতে ভক্তিনম্র প্রার্থনার ফুল ফুটে ওঠে। অনেক পুণ্যার্থী জানান, কিশোরগঞ্জের মতো ঐতিহ্যবাহী শহরে কুমারী পূজার এই শুভ সূচনা কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি তাদের ধর্মীয় চেতনার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। শহরের সর্বস্তরের মানুষের সহমর্মিতা, পারস্পরিক অসাম্প্রদায়িক প্রীতি ও সানন্দ অংশগ্রহণ এই আয়োজনকে আরও বেশি অর্থবহ ও নান্দনিক করে তোলে। অনুষ্ঠানটিকে সাফল্যমণ্ডিত এবং সুশৃঙ্খল রাখতে মন্দির কমিটি ও স্থানীয় আয়োজকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। উপচে পড়া ভিড় সামাল দিতে এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা পূণ্যার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ স্বেচ্ছাসেবক দল নিরলসভাবে কাজ করে যায়। মণ্ডপ প্রাঙ্গণে সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল, যার ফলে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই শত শত ভক্ত নির্বিঘ্নে দেবী দর্শন এবং অঞ্জলি প্রদান করতে পেরেছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো, যা গোটা আয়োজনে এনে দিয়েছিল এক আশ্বস্ত ও নিরাপদ আবহ। বিকেলের দিকে যখন লালচে সূর্যের আলো মন্দির চত্বরের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, তখন কুমারী পূজার আচার ও প্রসাদ বিতরণের পর্ব সমাপ্তির দিকে এগোয়। প্রসাদ গ্রহণের লাইনে দাঁড়ানো অগণিত পুণ্যার্থীর হাসিমুখ আর ভক্তিময় চোখ যেন বলছিল, প্রথমবারের এই অনন্য অভিজ্ঞতা তাদের হৃদয়ে বহুকাল অমলিন হয়ে থাকবে। এই রূপ, এই পরিবেশ এবং এই পবিত্রতা কিশোরগঞ্জের মেলা ও পূজার ইতিহাসকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল। কিশোরগঞ্জের কালীবাড়ি মণ্ডপে অনুষ্ঠিত এই প্রথম কুমারী পূজা কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার এক চেনা ফ্রেম নয়, এটি হয়ে রইল ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সামাজিক মেলবন্ধন এবং অন্তরের পরম ভক্তির এক চিরন্তন দলিল। ঢাকের ঢং ঢং শব্দ আর শঙ্খধ্বনি হয়তো একসময় থেমে যাবে, কিন্তু মহিমাময়ী কুমারী পূজার সেই অমর স্মৃতি ও অপার্থিব প্রশান্তি কিশোরগঞ্জের মানুষের মনে সুদীর্ঘকাল ধরে সুর ঝঙ্কার তুলবে। নতুন আশা, পবিত্রতা ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে এই ঐতিহাসিক শুভ সূচনা কিশোরগঞ্জের বুকে এক অক্ষয় ও স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে খোদাই হয়ে রইল।