• মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম
অবশেষে শিশু ধর্ষণকারী সাবেক বিজিবি সদস্য আব্দুল মান্নান র‍্যাব এর অভিযানে গ্রেফতার কিশোরগঞ্জে নতুন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের যোগদান : ফুলেল অভ্যর্থনা ও গার্ড অব অনারে বরণ অন্ধকার আর অসহনীয় গরমে ‘মৃত্যুফাঁদ’ কটিয়াদী হাসপাতাল জেনারেটর বিকল, জিম্মি শত শত রোগী হাওরে সোনালী স্বপ্নের সলিল সমাধি : পানির নিচে তলিয়ে কৃষকের হাড়ভাঙা শ্রম, দিশাহারা কৃষক। আত্রাইয়ে এলজিইডির প্রকৌশলীর কাছে তথ্য চাওয়ায় সাংবাদিক হেনস্তার শিকার আইকন ও ইকরা ট্রাভেল এন্ড ভিসা কনসাল্টেন্স সেন্টার নামে প্রতারনা ও টর্চার ছেলের সন্ধান মিলছে রাজধানী ঢাকায়। কোনাবাড়ীতে ছাত্রদল নেতার সংবাদ সম্মেলন – ক্রয়কৃত জমি দখলে বাধাঁ ও হামলার অভিযোগ। কিশোরগঞ্জে বর্ণিল আয়োজনে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপিত : শোভাযাত্রায় জনতার ঢল। কিশোরগঞ্জে সোনালী ফসলের হাসি : বোরো ধান কাটার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। কিশোরগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর বার্তা : শান্তি বজায় রাখতে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান।

হাওরে সোনালী স্বপ্নের সলিল সমাধি : পানির নিচে তলিয়ে কৃষকের হাড়ভাঙা শ্রম, দিশাহারা কৃষক।

সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি / / ১৯ Time View
Update : সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬

21

সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :

বিস্তীর্ণ হাওর। যেদিকেই চোখ যায়, কেবল পানির তোলপাড়। অথচ মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগেও এই হাওর ছিল সোনালী ধানে পরিপূর্ণ। বাতাসের তালে দুলছিল কৃষকের আপ্রাণ পরিশ্রমের ফসল। সেই ধানের ঘ্রাণে তখন স্বপ্ন দেখছিলেন কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জের হাজারো কৃষক। কিন্তু প্রকৃতির নিষ্ঠুর খেলায় আর অপরিকল্পিত উন্নয়নের খেসারতে দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে এখন সেই স্বপ্নের সোনালী ধান পানির নিচে। তলিয়ে গেছে কৃষকের হাড়ভাঙা শ্রম, আর তার সাথে সাথে ধুলিসাৎ হয়েছে আগামীর সব আশা।​ চোখের সামনেই তলিয়ে গেল ‘সোনার ফসল’। কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার খয়েরপুর-আব্দুল্লাহপুর ও আদমপুর ইউনিয়ন এবং হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার শিবপুর ও মাদনা এলাকা এখন কান্নার রোল। কৃষকদের দাবি, দুই জেলায় অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান এখন পানির নিচে। যে ধান কয়েক দিনের মধ্যেই ঘরে তোলার কথা ছিল, তা এখন পচতে শুরু করেছে। অনেক কৃষক বুকসমান পানিতে নেমেও ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন, কিন্তু স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে সেই ধান ঘরে তোলার সাধ্য কোথায়? অনেক জমি তলিয়ে গেছে এতটাই গভীরে যে, সেগুলো কাটার আশা একেবারেই ছেড়ে দিয়েছেন কৃষকরা।​ ঋণের বোঝা এবং কান্নায় ভেজা কৃষক আর হাওরপারের চিত্রটি এখন হৃদয়বিদারক। অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক মোগল মিয়ার (৬৫) কান্না থামছে না। মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ১০ একর জমিতে এবার বোরো আবাদ করেছিলেন তিনি। ১১ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ আর সন্তানের পড়াশোনার খরচ—সবই ছিল এই ফসলের ওপর নির্ভরশীল। মোগল মিয়া হাউমাউ করে কেঁদে বললেন, “ভাই সংবাদ কইরা কী আর অইব, আমার সর্বনাশ অয়া গেছে। সোনার ধানগুলো পাইক্কা গেছিন, আর কয়েকটা দিন গেলেই কাটতে পারতাম। একটা ধানও ঘরে আনতে পারলাম না। এহন পরিবার নিয়া কেমনে চলাম আমি।”​একই দশা কৃষক মিঠু মিয়ার (৬০)। দেড় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, “কী আর করাম, বুকটা ফাইট্টা যাইতাছে। সন্তানের মতো ধান। দুই-তিনটা মাস লালন পালন কইরা বড় করছি। এহন এইগুলো পানির নিচে। “​​কৃষকদের মতে, শুধু বৃষ্টিই নয়, এই বিপর্যয়ের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ভুল পরিকল্পনা। হাওরে পরিবেশের তোয়াক্কা না করে নির্মিত উঁচু রাস্তা, অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং পলি জমে নদী ভরাট হয়ে যাওয়াই এই জলাবদ্ধতার মূল কারণ। হবিগঞ্জের খোয়াই নদী ভরাট হওয়ায় প্রতিবছরই পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে হাওরে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্থানীয়রা বলছেন, ফসল রক্ষার জন্য যে বাঁধ নির্মাণের কথা, সেই বাঁধই উল্টো পানির প্রবাহ আটকে দিয়ে সর্বনাশ ডেকে আনছে।​কৃষকের এই চরম দুর্দশার সময়েও সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে দেখা দিয়েছে বিতর্ক। যেখানে কৃষকরা বলছেন আড়াই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে, সেখানে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম। অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, প্রথম দফায় ২০ হেক্টর এবং গত দুই দিনে মাত্র ৯ হেক্টর ধান তলিয়েছে।​কৃষকরা এই হিসাবকে ‘হাস্যকর’ বলে অভিহিত করেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ডঃ মোহাম্মদ সাদিকুর রহমান স্বীকার করেছেন যে, পলি পড়ে নদীর প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেছেন, ধানগাছ ৫-৬ দিন নিমজ্জিত থাকলে বড় ধরনের ক্ষতি হবে, তার আগে পানি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কম হতে পারে।​​ হাওরপারের বাতাস এখন ভারী হয়ে আছে পচা ধানের গন্ধে। একে একে নিভে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন। ঋণের টাকা পরিশোধ করা তো দূরের কথা, আগামী এক বছর কীভাবে সংসার চলবে, সেই চিন্তায় পাথর হয়ে গেছেন কৃষকরা। মাঠজুড়ে পড়ে থাকা সোনালী ধান এখন কেবলই আক্ষেপের চিহ্ন। হাওরের আকাশ কি তবে কৃষকের কান্নায় আরও ভারী হয়ে থাকবে? নাকি দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াবে প্রশাসন সেই প্রশ্নই এখন হাওরবাসীর মনে।


More News Of This Category
bdit.com.bd