• শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২২ অপরাহ্ন
শিরোনাম
কিশোরগঞ্জে বিপন্ন হাওরের রুপালি ঐশ্বর্য : হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি ভাসান পানির বাসিন্দারা টঙ্গীতে চাঁদাবাজি মামলায় গ্রেপ্তার বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা রাতুল সিকদার অমি গাজীপুরে এক বছর পর ধরা পড়ল নাসির পালোয়ান হত্যা মামলার আসামি প্রধানমন্ত্রীর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নাগরী ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে বিভিন্ন জাতের চারা গাছ বিতরন গাজীপুরে ডেকে নিয়ে যুবককে এলোপাতাড়ি মারধরের অভিযোগ, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত গাজীপুরে কয়ের উচ্চ বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন হাফিজুল ইসলাম বুলবুল গাজীপুরে ব্যবসায়ীকে কৃষক দল কর্মীর হুমকির অভিযোগ, কেটে দেওয়া হলো ইন্টারনেটের কেব্‌ল বিয়ের সাজে গাড়িতে কনে, পথ আটকে ছিনতাই! হোসেনপুরে ফিল্মি কায়দায় বরযাত্রীতে হামলা শান্তি ও অগ্রযাত্রার নবসংকল্প, কিশোরগঞ্জের জননিরাপত্তা ও নদী-হাওরের উন্নয়নে মতবিনিময়ে প্রতিশ্রুতির সুর প্রতিধ্বনি কোনাবাড়ীতে আগামীকাল ৭ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকবে না

কিশোরগঞ্জে বিপন্ন হাওরের রুপালি ঐশ্বর্য : হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছ, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি ভাসান পানির বাসিন্দারা

সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি / / ১৭ Time View
Update : শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

23

সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :

আকাশের নীল আর ধানি জমির গাঢ় সবুজ যেখানে একাকার হয়ে মেশে, সেখানেই ভেসে ওঠে পলিবিধৌত বিস্তীর্ণ ভাটি বাংলা—আমাদের হাওরাঞ্চল। বর্ষায় কুলকিনারাহীন সায়রের রূপ, আর শুষ্ক মৌসুমে সবুজ শস্যের চাদর। ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, বাজিতপুর আর তাড়াইলের বিশাল জলধি জুড়ে প্রকৃতি একসময় ঢেলে দিয়েছিল তার রূপ ও সম্পদ। এক ফসলি জমির এই প্রান্তরে বোরো ধান কাটার পর যখন অথৈ পানি চারপাশকে গ্রাস করে, তখন হাওর বাসীর একমাত্র সম্বল হয়ে ওঠে রূপালি মৎস্যসম্পদ। কিন্তু সেই জলমহালগুলোতে আজ কান পাতলে শোনা যায় এক নীরব ক্রন্দন—প্রাকৃতিক নৈসর্গিক পরিবর্তনের তোড়ে ও মনুষ্যসৃষ্ট হঠকারিতায় হাওর থেকে ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা দেশীয় প্রজাতির মাছ। জীবন ও জীবিকার এই অমোঘ সংকটে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার জেলে পরিবার। ​ভোরের আলো ফোটার আগেই হাওরের ঢেউয়ের বুকে ছড়িয়ে পড়ত সারি সারি ডিঙি নৌকা। কোনো নৌকায় বৈঠার ছপছপ শব্দ, আবার কোনোটিতে ছাঁকি কিংবা ঝাঁকি জাল ফেলার ঝুপঝাপ গুঞ্জন। পাবদা, টেংরা, কাইকা, আইড়, রিঠা, কিংবা গজার আর মহাশোলের মতো রুপালি শস্যের ঝলকানি দেখে হাসিতে ভরে উঠত জেলেদের মুখ। সেই উপার্জনে চলত সংসার, মেটানো হতো সন্তানের পড়ার খরচ, জোগান দেওয়া হতো বয়স্ক পিতা-মাতার ওষুধের পয়সা। কিন্তু আজকের চিত্র বড়ই করুণ। জাল ফেলে দীর্ঘ সময় বসে থেকেও খালি হাতে কিংবা সামান্য কিছু ছোট মাছ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে ঘাটে। ঘাটে ফেরা নৌকাগুলোর শূন্যতা যেন জেলেদের ঘরে ঘরে নামিয়ে আনছে অনাহারে-অর্ধাহার। ​হাওরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও দ্রুত সংকট ঘনীভূত হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে প্রধানত দুটি বড় কারণ—অবাধে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কায় অকালে বা দ্রুত পানি শুকিয়ে যাওয়া। সম্প্রতি হাওরজুড়ে একশ্রেণির লোভী ও অসাধু চক্র চালু করেছে ক্ষতিকারক কারেন্ট জাল, সুতি জাল, এবং অতিসূক্ষ্ম ‘চাই’ ও ‘চায়না দুয়ারি’ জালের অবাধ ব্যবহার। এই জালগুলো হাওরের তলদেশ পর্যন্ত একদম ছেঁকে ফেলে। ফলে শুধু পূর্ণাঙ্গ মাছই নয়, রেণু পোনা, এমনকি ডিমওয়ালা মাছও রেহাই পাচ্ছে না। প্রকৃতি যে প্রজ্বলন প্রক্রিয়ায় বছর বছর নতুন প্রাণ সৃষ্টি করত, মনুষ্যসৃষ্ট এমন নির্মম ধ্বংসযজ্ঞে তা গোড়াতেই উপড়ে ফেলা হচ্ছে। ​এর সাথে যোগ হয়েছে প্রাকৃতিকভাবে হাওরে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব। আগের মতো যথাসময়ে বৃষ্টিপাত না হওয়া, আবার অকালেই হাওরের নদী ও খাল-বিলগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাওয়া এক বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ড্রেজিংয়ের অভাবে হাওরের অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর নাব্যতা কমে যাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে কুঁড় বা মা মাছের প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থলগুলো একেবারে পানিশূন্য হয়ে পড়ে। বর্ষার শুরুতে ডিম ছাড়ার জন্য যে শান্ত জল ধারার প্রয়োজন হয়, জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় তা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে মা মাছ ডিম ছাড়ার আগেই বা প্রজনন মৌসুমে অবাধে শিকার হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী বংশবৃদ্ধি চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ​মৎস্যজীবীদের দিনযাপন এখন কেবল বেঁচে থাকার সংগ্রামের এক করুণ মহাকাব্য। যে হাওরে হাজার বছর ধরে বংশপরম্পরায় জেলেরা মাছ ধরে জীবনধারণ করেছেন, সেই হাওরে এখন তাদের বুকভাঙা দীর্ঘশ্বাস। সন্তানকে স্কুলে পাঠানো দূরের কথা, তিন বেলা অন্নসংস্থান করাই হয়ে উঠেছে অলৌকিক এক চ্যালেঞ্জ। বহু জেলে পরিবার তাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা ছেড়ে দিনমজুরির কাজ কিংবা কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছেন ইটভাটা ও দূর শহরের ধূলিধূসর গলিতে। ​তবে এই অন্ধকারময় পরিস্থিতির মধ্যে আশার আলো ছড়াতে শুরু করেছে কিছু সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ। হাওরাঞ্চলের এই সংকট কাটিয়ে দেশি মাছের আবাদ ও বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনতে বিশেষ তৎপর হয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে দেশের নীতি-নির্ধারকরা। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান হাওরের ঐতিহ্যবাহী মৎস্যসম্পদ রক্ষায় একাধিক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নিচ্ছেন। স্থানীয় জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি, অবৈধ জালের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কঠোর অভিযান এবং অভয়াশ্রম গড়ে তোলার বিষয়টি তিনি জোরদার করছেন।
​পাশাপাশি, দেশের হাওরাঞ্চলকে মৎস্য সম্পদের স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাণ্ডারে রূপান্তর করতে এবং দেশীয় প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব রক্ষায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গ্রহণ করেছেন যুগান্তকারী ও বিশেষ পদক্ষেপ। সরকারের পক্ষ থেকে হাওরাঞ্চলে মা মাছের সুরক্ষায় বিল-নার্সারি স্থাপন, নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ ধরা নিষিদ্ধকরণে জেলেদের বিশেষ ভিজিএফ চাল সহায়তা প্রদান, জলমহাল ইজারা নীতিমালায় জেলের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং বিল খনন বা নাব্যতা ফেরানোর প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ​হাওর কেবল একটি জলাভূমি নয়, এটি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং বিশাল এক লোকসংস্কৃতির ধারক ও বাহক। দেশি মাছের অভয়াশ্রমগুলো সংরক্ষণ করা না গেলে কেবল যে রুপালি মাছ হারিয়ে যাবে তা নয়, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে হাওরাঞ্চলের শতাব্দীপ্রাচীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো। সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং টেকসই মৎস্য ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই কেবল ফেরানো সম্ভব হাওরের সেই হারানো যৌবন, আর তবেই নিশ্চিন্ত হাসিতে ফিরে আসবে বিপাকে পড়া জেলেদের জীবন।


More News Of This Category
bdit.com.bd