সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি :
শীতের আগমনী সুর বাজলেও, কিশোরগঞ্জের বিস্তৃত হাওর অঞ্চলের চিত্র এবার ভিন্ন। সাধারণত এই সময়ে হাওরের পানি নেমে আসে এবং জমি চাষাবাদের জন্য উপযোগী হতে শুরু করে। কিন্তু এ বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় এখনও হাওরের বেশিরভাগ এলাকা জলমগ্ন। আর এই বিলম্বিত জলরাশিই পড়ন্ত বিকেলে হাওরপাড়ের জেলেদের জন্য নিয়ে এসেছে এক ভিন্ন ধরনের মাছ ধরার উৎসব। সূর্য যখন পশ্চিম দিগন্তে কমলা-লাল আভা ছড়াতে শুরু করে, তখন হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি এক মায়াবী রূপ ধারণ করে। সাধারণত, পানি কমতে শুরু করলে স্থানীয় ‘ বাউত ‘ (বেঁড়া জাল) বা ‘ খরা জাল ‘ দিয়ে মাছ ধরা হয়। কিন্তু এবার জলস্তর বেশি থাকায়, জেলেরা ডিঙি নৌকায় করে গভীর জলে গিয়ে টানা জাল (Sweep Nets) ও খেও জাল (Seine Nets) ব্যবহার করছেন। মিঠামইনের ঘাগরা বিলের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হলো অভিজ্ঞ জেলে রতন বর্মণের (৫৮) সাথে। তিনি জানালেন, “শীত নামলেও পানি এবার নামেনি। তাই মাছগুলো এখনও বিলে বা জলমহালের গভীরে রয়েছে। আমরা দল বেঁধে বিকেলে বের হই। এই সময়ে মাছের ঝাঁক খাবারের সন্ধানে একটু ওপরে ওঠে, তখনই জাল ফেলি। পড়ন্ত বেলার আলোয় জাল ফেলার দৃশ্যটা দেখতেও খুব সুন্দর লাগে, যেন জলের ওপর সোনার রেখা পড়ছে। “পানি বেশি থাকায় এ বছর জালে ধরা পড়ছে বেশ বড় আকারের রুই, কাতল, আইড়, বোয়াল, শোল ও গজার মাছ। বিশেষ করে, হাওরের গভীর জলের সুস্বাদু পাবদা, টেংরা ও বাইম মাছের চাহিদাও এখন তুঙ্গে। সন্ধ্যার ঠিক আগে, যখন চারপাশ হালকা আঁধারে ঢেকে যায়, তখন একযোগে জাল টেনে মাছ তুলে আনার দৃশ্যটি যেকোনো পর্যটকের জন্য এক আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা। নিকলীর জেলে আব্দুল হালিম বলেন, “শীত নামলেও জলের গভীরতা পাওয়ায় মাছের আকার বড় হয়েছে। একেকটা বোয়াল মাছ ৫-৭ কেজি পর্যন্ত হচ্ছে। বাজারে চাহিদা খুব, দামও ভালো পাচ্ছি। “হাওরের জমি চাষে দেরি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে কিছুটা হতাশা থাকলেও, মাছ ধরার এই উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তি এনেছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় শত শত নৌকা যখন তাজা মাছে ভর্তি হয়ে ঘাটে ফেরে, তখন মাছ ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ভিড় বাড়ে। হাওরের মৎস্য আড়তগুলো রাত নামার সাথে সাথে সরগরম হয়ে ওঠে। তবে হাওর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলস্তরের এই অস্বাভাবিকতা দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগজনক। কারণ, চাষে দেরি হলে বোরো ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সার্বিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, শীতের শুরুতে কিশোরগঞ্জের হাওরে পড়ন্ত বিকেলে জাল ফেলে মাছ ধরার দৃশ্যটি প্রকৃতি এবং জীবন-জীবিকার এক দারুণ সমন্বয়কে ফুটিয়ে তুলেছে—যা একইসাথে সংগ্রামের ও সৌন্দর্যের প্রতীক।