• শনিবার, ১৫ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাঁধে করের ভার, কিশোরগঞ্জে রিটার্ন দাখিলে এক দশকের সর্বনিম্ন ধস গাজীপুরে ঝুট ব্যবসার দখল নিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, সাংবাদিককে কুপিয়ে জখম তুহিন হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি চাইলেন সাংবাদিকরা, গাজীপুরে মানববন্ধন গাজীপুর চান্দনা চৌরাস্তায় আবাসিক হোটেলে অনৈতিক কার্যকলাপ, মাদক ও অপরাধ বন্ধের দাবিতে শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন গাজীপুর মহানগরীর ১৮ নং ওয়ার্ডে দুই দিন পরপর মিটারের তার চুরি, আতঙ্কে এলাকাবাসী গাজীপুরে হত্যার উদ্দেশ্যে মব সৃষ্টির চেষ্টা–অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেন সাংবাদিক ‎সাংবাদিকের ওপর হামলা ও মোবাইল ছিনতাইয়ের চেষ্টার অভিযোগ গাজীপুর বাসনে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রির অভিযোগ, তদন্তের দাবি স্থানীয়দের গাজীপুরে গাঁজা সেবনে বাধা দেওয়ায় ৮ম শ্রেণির ছাত্রের ওপর কিশোর গ্যাংয়ের হামলা, থানায় লিখিত অভিযোগ বাংলাদেশ প্রেস-ক্লাব গাজীপুর মহানগর শাখার সাংগঠনিক উন্নয়ন সভা ও সাংবিধানিক প্রশিক্ষণ এবং গ্রীষ্মকালীন ফল উৎসব অনুষ্ঠিত

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাঁধে করের ভার, কিশোরগঞ্জে রিটার্ন দাখিলে এক দশকের সর্বনিম্ন ধস

সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি / / ১৫ Time View
Update : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

36

সৈয়দ মইনুল হোসেন, জেলা প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ :

করজাল বিস্তৃত করে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর বড় পরিকল্পনা ছিল সরকারের। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সার্বজনীন করভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি নীতিমালা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে হিতে বিপরীত ফলাফলে। অনমনীয় ‘টার্নওভার কর’ এর কঠিন বাধ্যবাধকতায় ঐতিহ্যবাহী জেলা কিশোরগঞ্জে আয়কর রিটার্ন দাখিলের চিত্র আশঙ্কাজনক ভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। কর কর্মকর্তাদের কার্যালয়ের দরজা খোলা থাকলেও উধাও করদাতাদের পদচারণা। জেলার আইনজীবী ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকের মধ্যে চলতি করবর্ষের শুরুতে আয়কর বিভাগে এমন নজিরবিহীন স্থবিরতা আগে কখনো দেখা যায়নি। এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক ও করুণ চিত্রটি ফুটে উঠেছে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) মাঝে। কর নীতিমালার নতুন গ্যাঁড়াকলে পড়ে জেলাজুড়ে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, এমনকি পাড়া-মহল্লার সাধারণ মুদি দোকানদাররাও এখন রিটার্ন দাখিল থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন। ​আগে যে করব্যবস্থা আয় এবং সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হতো, সেখানে ঢালাওভাবে টার্নওভার কর চাপিয়ে দেওয়াকে মূল কারণ হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। মাত্র কয়েক লাখ টাকার বাৎসরিক লেনদেন করা একজন খুচরা ব্যবসায়ীকে রিটার্ন দাখিল করতে গিয়ে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কর পরিশোধের হিসাব কষতে হচ্ছে। যেখানে বর্তমান বাজারে নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং মূলধন সংকটে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই দায়, সেখানে আয়ের চেয়ে বেশি করের এই বাড়তি চাপ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই তারা নিজেদের করব্যবস্থা থেকে গুটিয়ে নিচ্ছেন। কিশোরগঞ্জ উপকর কমিশনারের কার্যালয় ও জেলা কর আইনজীবী সমিতি সূত্রে পাওয়া তথ্যে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক চিত্র উদঘাটিত হয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ করবর্ষে জেলার কর সার্কেলগুলোতে রিটার্ন দাখিলের হার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ​সাধারণত প্রতি করবর্ষের শুরুতে—বিশেষ করে জুলাই থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে জেলা সদরে অবস্থিত কিশোরগঞ্জ কর সার্কেল-১৩ ও ১৮-তে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকত। সার্কেলগুলোতে কয়েক শ করদাতা সশরীরে উপস্থিত হয়ে রিটার্ন জমা দিতেন। নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, প্রতিবছরের শুরুতেই অন্তত পাঁচ শতাধিক রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমে আয়কর-সংক্রান্ত জটিল ও অমীমাংসিত অনেক মামলা নিষ্পত্তি হয়ে যেত। ​অথচ চলতি করবর্ষের চিত্র পুরোই মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। একই সময়ে এবার দুই সার্কেল মিলিয়ে রিটার্ন দাখিল হয়েছে মাত্র শতাধিক বা তার কিছু বেশি। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মোট রিটার্ন দাখিলকারীদের মধ্যে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতির হার অর্ধেকেরও কম—গাণিতিক হিসাবে যা মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। যে রাজস্ব নীতির মূল দর্শন ছিল নতুন করদাতা তৈরি করে করজাল বিস্তৃত করা, সেই নীতিই যদি সাধারণ মানুষকে কর ব্যবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শঙ্কিত করে তোলে, তবে এর বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কেন সৃষ্টি হলো? এর পেছনের মূল গলদটি উন্মোচন করেছেন কিশোরগঞ্জ জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি আইনজীবী আবুল কাসেম। তার মতে, টার্নওভার করের পরিধি ও প্রয়োগপদ্ধতিতে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিবর্তনই আজকের এই মন্দার মূল চালিকাশক্তি। ​তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, “বিগত বছরগুলোতে যেসব প্রতিষ্ঠানের বাৎসরিক বিক্রি বা প্রাপ্তির পরিমাণ কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা ছিল, মূলত তাদের ওপরই ১ শতাংশ হারে টার্নওভার কর ধার্য করা হতো। একটি বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য এই হার সামলানো সহজ হলেও, এবার নতুন বিধিতে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকার সামান্য কেনাবেচা করা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপরও একইভাবে ১ শতাংশ টার্নওভার কর কার্যকর করা হচ্ছে।” ​আইনজীবীদের অভিযোগ, একজন শত কোটি টাকার টার্নওভার করা প্রতিষ্ঠানের জন্য করের যে হার, গ্রামের বা মফস্বলের একজন খুচরা চাল বা মুদি বিক্রেতার ওপর একই হার চাপানো একটি চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য। বাস্তব আয়ের হিসাব না করে শুধু কেনাবেচার ওপর এই কর ধার্য করার কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা তাদের প্রকৃত উপার্জনের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে আইনি করকাঠামোর প্রতি সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও অনাস্থা তৈরি হয়েছে। উপকর কমিশনারের কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নূরুস সালাম সামগ্রিক পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করেছেন। দফতরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত থাকলেও সেবাগ্রহীতাদের অনুপস্থিতি দৈনন্দিন চিত্রে পরিণত হয়েছে। ​তিনি বলেন, “চলতি করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের হার অস্বাভাবিকভাবে কম। কেন সাধারণ ব্যবসায়ীরা আগ্রহ হারাচ্ছেন এবং এর পেছনে টার্নওভার করের কী প্রভাব রয়েছে, সে সম্পর্কে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে। “কিশোরগঞ্জের মতো একটি বাণিজ্যিকভাবে গতিশীল জেলায় করদাতাদের এই বিমুখতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রাজস্ব আদায় বাড়াতে গিয়ে নীতি নির্ধারণে মাঠপর্যায়ের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ছোট ব্যবসায়ীদের সামর্থ্যকে উপেক্ষার ফলাফলই এই স্থবিরতা। বিশ্লেষকদের মতে, করনীতিতে দ্রুত নমনীয়তা না আনলে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ কর ছাড় বা সহজ ব্যবস্থার পুনর্বাসনে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে, করের আওতা বাড়ার বদলে একটি বড় অর্থনৈতিক অংশকে কর ব্যবস্থার পুরোপুরি বাইরে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যাবে। ​এখন দেখার বিষয়, রাজস্ব বোর্ড কিশোরগঞ্জের এই বাস্তব সংকেত থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের বাঁচিয়ে রাখতে করকাঠামোতে কোনো নীতিগত পরিবর্তন আনে কি না।


More News Of This Category
bdit.com.bd